জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় এ. ও. হিউমের ভূমিকা
এই ব্লগে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে এ. ও. হিউম কিভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং তার এই উদ্যোগ কীভাবে পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বীজ বপনে সহায়ক হয়।
ভূমিকা
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় সূচিত হয় ১৮৮৫ সালে — ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই রাজনৈতিক দলটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলে পরিণত হয়। এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠার পেছনে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি হলেন একজন ব্রিটিশ প্রশাসক এবং অবসরপ্রাপ্ত আই.সি.এস কর্মকর্তা — এলান অক্টাভিয়ান হিউম (Allan Octavian Hume)। আজকের এই ব্লগে আমরা বিশ্লেষণ করব জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের অবদান এবং এর তাৎপর্য।
এ. ও. হিউম কে ছিলেন?
এ. ও. হিউম ১৮২৯ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে (ICS) যোগ দেন এবং পরে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের চিফ কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভারতীয় কৃষকদের দুর্দশা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার কথা বলার কারণে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়েন। ১৮৭৯ সালে তিনি ICS থেকে অবসর নেন এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সক্রিয় হন।
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ( জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় এ. ও. হিউমের ভূমিকা )
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে ধীরে ধীরে এক রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে উঠতে শুরু করে। ইংরেজদের অবিচার, কৃষক শোষণ, এবং প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটেই হিউম ভারতীয় নেতাদের একত্রিত করে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসেন।
হিউমের ভূমিকা: কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া
১৮৮৪ সালে হিউম বেশ কয়েকজন ভারতীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং তাদের নিয়ে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ফোরাম গঠনের পরিকল্পনা করেন। তিনি ৭২ জন প্রতিনিধিকে একত্রিত করে ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বে (বর্তমান মুম্বই)-তে প্রথম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন আয়োজন করেন। এই সভার সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি। হিউম নিজে কংগ্রেসের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন এবং সংগঠন পরিচালনার জন্য কাঠামোগত সহায়তা প্রদান করেন।
হিউমের উদ্দেশ্য কী ছিল?
- তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতীয় জনগণের অসন্তোষ যদি নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রকাশের সুযোগ না পায়, তাহলে তা একদিন বিদ্রোহে পরিণত হতে পারে।
- একটি রাজনৈতিক সংগঠন থাকলে সরকার জনগণের দাবিগুলি শুনবে এবং সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব হবে।
- তিনি ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে একটি শান্তিপূর্ণ এবং যুক্তিবাদী পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
ভারতীয় নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া
শুরুর দিকে অনেক ভারতীয় নেতা হিউমের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হন। তবে কিছু নেতা মনে করতেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তা হিসেবে হিউম হয়তো ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যেই কাজ করছেন। তবুও, ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রয়োজনে অধিকাংশ নেতা তার সঙ্গে সহযোগিতা করেন।
হিউমের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
হিউমের প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ধীরে ধীরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখ্য সংগঠনে পরিণত হয়। যদিও তিনি ১৮৯০ সালের পর কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব থেকে সরে যান, তবুও তার শুরু করা আন্দোলন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত গড়ে দেয়। কংগ্রেসই পরবর্তীতে গান্ধীজির নেতৃত্বে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ, সল্ট মার্চ ও কোয়িট ইন্ডিয়া আন্দোলনের মত বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলে।
উপসংহার
এ. ও. হিউমের উদ্যোগ ছাড়া হয়তো ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মতো একটি সর্বভারতীয় সংগঠন এত দ্রুত সম্ভব হতো না। যদিও তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ, কিন্তু তার সাংগঠনিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা এবং ভারতের প্রতি সহানুভূতির জন্য তাকে ভারতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে রাখা হয়। জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এরকম আরো পাঠ্য উপযোগী আর্টিকেল পেতে ভিজিট করুন artsschool.in