নবম ও একাদশ শ্রেণির ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। জাতীয়তা, সংঘর্ষ ও শান্তির দ্বন্দ্ব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা।
জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ
বিষয়ঃ নবম ও একাদশ শ্রেণি ইতিহাস (WBBSE) | ব্লগঃ Artsschool.in
ভূমিকা
জাতীয়তাবাদ (Nationalism) ও আন্তর্জাতিকতাবাদ (Internationalism) আধুনিক বিশ্বের রাজনীতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ।
১৯শ ও ২০শ শতকে এই দুটি ধারা ইতিহাসকে নতুন রূপ দিয়েছে। একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে যেমন জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ,
তেমনি বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতার জন্য আন্তর্জাতিকতাবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। এই পাঠে আমরা এই দুই মতবাদের উৎপত্তি, বিকাশ এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনা করব।
জাতীয়তাবাদ কী?
জাতীয়তাবাদ একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা জাতির স্বার্থ, ঐক্য এবং আত্মপরিচয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়।
এটি একটি জাতিকে অন্য জাতির থেকে আলাদা করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য
- জাতীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপর গর্ব
- স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি
- রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমানার উপর জোর
- একক ও অভিন্ন জাতি গঠনের প্রচেষ্টা
জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ
আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্ম হয় ইউরোপে, বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এবং শিল্প বিপ্লবের পর।
ফরাসি বিপ্লব মানুষকে “জাতি” বা “রাষ্ট্রীয় জনগণ” হিসেবে চিন্তা করার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
১৯শ শতকে ইতালি ও জার্মানির একীকরণ জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আন্তর্জাতিকতাবাদ কী?
আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো এমন একটি মতবাদ যা সমগ্র বিশ্বের মানুষকে একটি বৃহত্তর মানবিক সমাজ হিসেবে দেখে।
এটি বিভিন্ন জাতি ও দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী।
আন্তর্জাতিকতাবাদের মূল বৈশিষ্ট্য
- বিশ্ব মানবতার উপর গুরুত্ব
- সীমান্তের বাইরে সহানুভূতির বিস্তার
- যুদ্ধবিরোধী মনোভাব
- বিশ্বসংস্থা ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
আন্তর্জাতিকতাবাদের বিকাশ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রয়োজনীয়তা আরও অনুভূত হয়।
জাতিসংঘ, লিগ অব নেশনসের মত সংস্থার সৃষ্টি এই মতবাদের ফল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও মানবাধিকার রক্ষায় এই ধারার ভূমিকা অপরিসীম।
জাতীয়তাবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতাবাদ
| জাতীয়তাবাদ | আন্তর্জাতিকতাবাদ |
|---|---|
| নিজ জাতির স্বার্থে অগ্রাধিকার | সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে বিশ্বাস |
| আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার উপর জোর | সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহানুভূতির উপর জোর |
| স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য | সার্বিক শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্য |
| যুদ্ধ ও সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি করে | যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী |
ভারতের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদ
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের জাতীয়তাবাদ ছিল একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এই মতবাদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যেখানে জনগণ একত্রিত হয়ে “স্বদেশি”, “বয়কট”, “স্বরাজ” ইত্যাদি আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছে।
উপসংহার
জাতীয়তাবাদ মানুষের আত্মপরিচয় ও ঐক্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় সংঘাতের কারণ হতে পারে।
অপরদিকে, আন্তর্জাতিকতাবাদ শান্তি ও সমন্বয়ের পথে আমাদের নিয়ে যায়।
তাই উভয় মতবাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই আধুনিক বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব।